আমলের জন্য ফিরে আসার ইচ্ছা ও রমজান

২৮৪

মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করে এমনি ছেড়ে রাখেননি। পৃথিবীকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে তাদের জন্য তিনি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। সেই পরীক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে জন্ম এবং মৃত্যু। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জন্ম সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তিনি তোমাদের যাচাই করে নিতে পারেন যে, কর্মক্ষেত্রে কে তোমাদের মধ্যে উত্তম’Ñ সূরা আল মুলক : ২। পরীক্ষার ফলাফলের সময়ও স্রষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন। আর সেই সময়কে বিশ্বাস করাকে ঈমানের অন্যতম অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। বিশ্বজগতের প্রতিপালক বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের জন্য কিছু মানদণ্ড স্থাপন করব, অতঃপর সেদিন কারো ওপরই কোনো রকম জুলুম হবে না; যদি একটি শস্যদানা পরিমাণ কোনো আমলও (তার কোথাও লুকিয়ে) থাকে, (হিসাবের সময়) তাকে আমি (যথার্থই) এনে হাজির করব, হিসাব নেয়ার জন্য আমিই যথেষ্ট’। (সূরা আল আম্বিয়া : ৪৭
মানব জাতি পৃথিবীতে এসে জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ বাবা-মায়ের কারণে আবার কেউ স্বেচ্ছায়। এক দল মুমিন, অন্য দল কাফির।
মুমিন যেমন পরীক্ষা পদ্ধতিকে বিশ্বাস করে তেমনি ফলাফলের সময়কে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তাই সে পরীক্ষা চলাকালীন সময় নষ্ট না করে সর্বোত্তম ফলাফল তথা প্রভুর সন্তুষ্টি হাসিলে প্রতিনিয়ত তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে। মুমিনের এই চেষ্টার উত্তম ফল দিতে মহান আল্লাহ সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘(মনে রাখবে), যা কিছু ভালো ও উত্তম কাজ তোমরা আগেভাগেই নিজেদের জন্য আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে রাখবে, তাই তোমরা তাঁর কাছে (সংরক্ষিত দেখতে) পাবে, পুরস্কার ও এর বর্ধিত পরিমাণ হিসেবে তা হবে অতি উত্তম।’ (সূরা আল মোযযাম্মেল : ২০)
মুমিন ব্যক্তি মৃত্যুর পর কবরে গিয়ে যখন প্রভু কর্তৃক জানতে পারে যে, সে জান্নাতি, তখন সে আল্লাহর কাছে কেয়ামত সংঘটিত করার জন্য দোয়া করতে থাকে, যেন সে তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে। (আবু দাউদ : ৪৭৫৩)
আরেক শ্রেণীর মুমিন সম্পর্কে জাবের রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, মুমিন যখন দেখতে পাবে তার কবর প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে, তখন সে বলবে, আমাকে ছেড়ে দাও আমি আমার পরিবারকে সুসংবাদ দিয়ে আসি (যে আমি বেহেশতের সুসংবাদ পেয়েছি)। (আহমদ-১৪৫৮৭)
কিন্তু মুমিনের জন্য সর্বোত্তম মৃত্যু শহীদের মৃত্যু। তাঁর আকাক্সক্ষা সবার চেয়ে ভিন্ন। আনাস রা: থেকে বর্ণিত রাসূল সা: বলেন, ‘জান্নাতে প্রবেশের পর একমাত্র শহীদ ছাড়া আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্সক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সব জিনিস তাকে দেয়া হয়। শহীদ পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্সক্ষা করবে। শাহাদাতের মর্যাদা দেখতে পেয়ে সে আরো দশবার শহীদ হওয়ার কামনা করবে।’ (বোখারি : ২৮১৭, মুসলিম : ১৮৭৭)
প্রসিদ্ধ মুফাসসির দাহহাক এবং ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ওই মুমিন যার অনেক সম্পদ রয়েছে, অথচ সে সম্পদের জাকাত দেয়নি, হজ আদায় করেনি, আল্লাহ ও বান্দাহর হক আদায় করেনি, তার মৃত্যু এসে গেলে সে আল্লাহর কাছে মৃত্যু থেকে রেহাই পেয়ে ভালো আমল করার সুযোগের নামে প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদের যা অর্থ সম্পদ দিয়েছি তা থেকে তোমরা (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই। (মৃত্যু এসে গেলে) সে বলবে, হে আমার রব, তুমি যদি আমাকে আরো কিছু কালের অবকাশ দিতে তাহলে আমি তোমার পথে দান করতাম এবং (এভাবেই) আমি তোমার নেক বান্দাহদের দলে শামিল হয়ে যেতাম।’ (সূরা আল মোনাফেকুন : ১০)
অন্য দিকে, কাফিরদের আকাক্সক্ষা হবে ব্যতিক্রম। সারা জীবনের মতো মৃত্যুমুখে পড়েও তারা স্রষ্টার সাথে প্রহসন করার শেষ চেষ্টা করবে। স্রষ্টাকে জানার দীর্ঘ সময় পেয়েও যে যাচ্ছেতাই জীবনযাপন করেছে, সে এই মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে স্রষ্টাকে জানার মিথ্যা সুযোগ চাইবে। মহান প্রভু বলেন, ‘(হে নবী), তুমি মানুষদের এক (ভয়াবহ) দিনের আজাব (আসা) থেকে সাবধান করে দাও (এমন দিন এলে) এ জালেম লোকেরা বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের তুমি কিছুটা সময়ের জন্য অবকাশ দাও; আমরা তোমার ডাকে সাড়া দেবো এবং আমরা রাসূলদের অনুসরণ করব (জবাবে বলা হবে); তোমরা কি সেসব লোক- যারা ইতোপূর্বে শপথ করে (নিজেদের মধ্যে) বলতে যে, তোমাদের (এ জীবনের) কোনো ক্ষয় নেই।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪৪) অন্যায়ে ডুবে থাকা মুমিন হোক কিংবা আল্লাহকে অস্বীকারকারী কাফির ব্যক্তি হোক অথবা চির সুখের জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত শহীদই হোক না কেন; কাউকেই পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হবে না। মহান মালিক বলেন, ‘(কিন্তু) কারো (নির্ধারিত) ‘সময়’ যখন এসে যাবে, তখন আল্লাহ তায়ালা কখনোই তাকে (এক মুহূর্ত) অবকাশ দেবেন না; তোমরা (দুনিয়ার জীবনে) যা কিছু করছ, আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত রয়েছেন।’ সূরা আল মোনাফেকুন : ১১)
কাফির, পাপী মুমিন অথবা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত শহীদের দুনিয়াতে ফিরে আসতে চাওয়া অসম্ভব হলেও প্রত্যেকের ফিরে আসতে চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রভুর বন্দেগি করা, যদিও কাফির ও পাপী মুমিনের ফিরে আসতে চাওয়াকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে।
যেহেতু মৃত্যু এসে গেলে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই, তাই প্রভুর সন্তুষ্টি হাসিলের একটাই পথ। আর তা হচ্ছে, পরীক্ষার সময় তথা দুনিয়ার জীবনকে যথার্থভাবে কাজে লাগানো। মুমিনের জন্য দুনিয়ার জীবনে সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রমাদান মাস। কারণ তাতে রয়েছে কদর নামক এক রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। (সূরা আল কদর-৩)
কদরের রাতে ইবাদাত করলে পেছনের সব গুনাহ মাপ হয়ে যায়। (বোখারি :১৯০১)
তাই পেছনের অন্যায়ের জন্য আফসোস না করে আজকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলমান রমাদান মাসের অতুলনীয় সাওয়াব অর্জন করে আশা জাগানিয়া জীবন গড়ার এখনই সময়। চলমান বিশ্বের ‘করোনা’ নামক মহামারীর মুসিবত মানবজাতিকে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে রমাদানকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করাটা যুক্তিসঙ্গত।
রমাদানে আমলের বর্ণনা শেষ করা স্থান ও সময় সাপেক্ষ। রমাদানে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ (বোখারি-মুসলিম) করে দেয়ার কারণে নেক আমল করাও সহজ। ঈমানসহ সাওয়াবের আশায় সাওম পালন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নফল সালাত আদায় করলে পূর্বের সব গুনাহ মাপ হয়ে যায়। (বোখারি ও মুসলিম)
সাওম রোজাদারকে দু’টি খুশির মুহূর্ত এনে দেয়; ইফতারের মুহূর্তে শয়তানকে পরাজিত করে প্রভুর জন্য সাওম সম্পন্ন করার ও আখিরাতে প্রভুর দর্শন লাভের আনন্দ। (মুসলিম) শেষ দশ দিন ইতেকাফ পালন করে (বোখারি-মুসলিম) নিশ্চিত লাইলাতুল কদর পেয়ে হাজার মাসের চেয়ে বেশি সাওয়াব অর্জনের সুযোগ। (সূরা আল ক্বদর-৩)
সাওম ও কুরআন রোজাদার ও কুরআন তেলাওয়াতকারীর জন্য আল্লাহর কাছে মুক্তির সুপারিশ করবে। (আহমদ)
বনী আদমের সব আমলের সাওয়াব দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হবে তবে সাওম ব্যতীত কারণ, সাওম আল্লাহর জন্য তার প্রতিদান তিনিই দেবেন। (মুসলিম :১১৫১) সাওমের সাওয়াবের কোনো সীমা নেই। কবিরা গুনাহ ছেড়ে দিলে এক রমাদান থেকে অন্য রমাদান পর্যন্ত সব গুনাহ মুছে দেয়া হবে। (মুসলিম) এ মাসে উমরা আদায় করলে হজ পালনের সাওয়াব পাওয়া যায়। (বোখারি-১৮৬৩) সাওম অপরাধ থেকে বেঁচে থাকতে ঢাল হিসেবে কাজ করে। (নাসায়ি : ২২১৭) একমাত্র রোজাদাররাই জান্নাতের রাইয়্যান দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। (বোখারি : ১৭৬৩, মুসলিম : ১৯৪৭) রমাদানে কিংবা ঈদুল ফিতরের নামাজের পূর্বে সাদকাতুল ফিতর আদায় করলে রোজাদারের আত্মা পবিত্র হয় এবং মিসকিনের আহারের ব্যবস্থা হয়। (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ)
ওই আমলগুলো যথার্থভাবে পালন করলে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় আমল করতে ফিরে আসার সুযোগ চাওয়া লাগবে না, শহীদের কথা ভিন্ন। বিশেষ করে এই মহামারীর বিপর্যস্ত সময়ে জাকাত, সাদকাতুল ফিতর ও স্বাভাবিক দানের মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রমাদানের অতুলনীয় সাওয়াব অর্জন করে প্রভুর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করার সুবর্ণ সুযোগ তো রয়েছেই। করোনার মতো মহামারীতে মৃত্যু বরণকারী শহীদের মর্যাদা পাবে। (বোখারি-মুসলিম) তাই এই মহামারী থেকে বেঁচে থাকতে উপযুক্ত পরিকল্পনা, ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত থাকার প্রাণপণ চেষ্টাই একমাত্র করণীয়।
লেখক : এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

এই বিভাগের আরও সংবাদ